পৃষ্ঠাসমূহ

শনিবার, ২৩ জুন, ২০১২

ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর

মোস্তাফা জব্বার


॥ চার ॥
এই কথাটি বাংলাদেশের কোন মানুষকে বলে দিতে হবে না যে, আমাদের ভূমির পরিমাণ সীমিত এবং এক সময়ে আমরা চাষের জমি তো দূরের কথা বসবাসের ভূমিও পাব না। প্রতিদিন চাষের জমি কমছে এবং বসবাসের জমি থাকছে না এটি কে না জানে। জমির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে এবং দেশের বেশির ভাগ মানুষকে এখন বস্তিবাসী হতে হবে এর কোন অন্যথা নেই। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবহারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এরই মাঝে অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়েছে। সরকার নাগরিকদের আবাসনের জন্য কোন ধরনের দায়িত্ব বহন না করায় আবাসন একটি পুঁজিবাদী বিকারের বিষয় হয়ে গেছে। যার টাকা নাই, তার ভূমিও নাই-বাড়িও নাই। যার জমিতে শ্রম দেবার ক্ষমতা আছে তার জমি নেই, কিন্তু তার জমি আছে যার টাকা আছে। আবাসন ব্যবসা এমনটাই শক্তিশালী হয়েছে যে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিকেরা সরকারের মন্ত্রীকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করে পার পেয়ে যেতে পারে। সরকারের জমিতে লোকেরা মাটি ভরাট করে বা দেয়াল তোলে। কিন্তু প্রশাসন কোন প্রশ্ন তুলতে পারে না। সাধারণ গরিব মানুষের জমি ভূমিদস্যুরা গিলে খায় সেখানে প্রশাসন বা বিচার বিভাগ কোন রক্ষাকবজ তৈরি করতে পারে না। এই অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হবে। ভূমিদস্যুতা অন্য যে কোন প্রকারের অন্যায়ের চাইতেও ভয়াবহ হয়ে ওঠবে। ভূমি নিয়ে টেঁটা-বল্লম আর লাঠির কাইজ্যা বন্দুকের লড়াইতে পরিণত হবে।
আমরা এর আগে জনকণ্ঠের একটি খবর দিয়ে এই তথ্যটি তুলে ধরেছি যে, প্রতি ঘণ্টায় আমাদের কৃষি জমি কমছে ১৮ একর। এভাবে চললে আগামী ৫০ বছরে এক ইঞ্চি জমিও থাকবে না চাষাবাদ করার জন্য। একই পত্রিকার খবরে আরও বলা হয় যে, ১৯৭৪ সালে মোট আবাদি জমি ছিল মোট জমির শতকরা ৫৯ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সেটি কমে ৫৩ শতাংশে নেমে আসে। এখনকার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ১ লাখ ৬০ হাজার একর আবাদি জমি কমছে। 
কিন্তু এত সব নির্মম সত্য আমাদের চোখের সামনে থাকার পরেও বর্তমানে নিয়ন্ত্রণহীন অপরিকল্পিকভাবে পুরো দেশের ভূমি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার যেখানে যা খুশি তাই করছে। জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে, কেটে ফেলা হচ্ছে পাহাড়। ফলে পরিবেশে বিপর্যয় ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০২১ সালে বাংলাদেশের মানুষের বাসস্থান এবং ফসলি জমি-কোনটাই পাওয়া যাবে না। সেজন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার পরিকল্পিত করার জন্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি নাগরিকের বাসস্থান এবং ফসলি জমি রক্ষা; দুটিই করতে হবে। রাষ্ট্র ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে ন্যূনতম মূল্যে তার পরিবারের জন্য ন্যূনতম বাসস্থান প্রদান করবে। যার বাসস্থান একসঙ্গে বা কিস্তিতে কেনার সামর্থ্য নেই রাষ্ট্র তাকে ন্যূনতম বাসস্থান প্রদান করবে। এই ন্যূনতম ব্যবস্থার বাইরে নাগরিকেরা নিজস্ব অর্থে বড় আকারের বা নির্ধারিত উন্নত স্থানে বাসস্থান কিনতে পারবে। দেশের সকল জমি বাসস্থান, ফসলি জমি, খাল-বিল, জলাশয়, শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মসজিদ-মন্দির, ঈদগাঁ, পার্ক বা খেলার জায়গা ইত্যাদিতে চিহ্নিত থাকবে। বর্তমানের ছনের-টিনের-সেমিপাকা-পাকা ঘরবাড়ির বদলে হাইরাইজ সমবায়ভিত্তিক উঁচু দালান নির্মাণ করে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এইসব বাসস্থানের জন্য পানি-পয়ঃনিষ্কাষণ, বিদ্যুত, বিনোদন, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি নিশ্চিত করা হবে। ফসলি জমির সর্বোচ্চ সিলিং হওয়া উচিত পাঁচ একর বা ৫০০ শতাংশ। ফসলি জমি কেবল কৃষকের কাছেই থাকা উচিত। বাসস্থানের জন্য রাজধানী শহরে ব্যক্তিগতভাবে ৩০ শতাংশের বেশি, জেলা শহরে ৫০ শতাংশের বেশি, উপজেলা বা থানা সদরে ১০০ শতাংশের বেশি জমির মালিক থাকা উচিত নয়। সকল খাসজমি কেবল ভূমিহীনদের প্রদান করা হবে। রাষ্ট্র উদ্বৃত্ত জমি বাজার দরে কিনে ভূমিহীনদের প্রদান করবে। ভূমিহীনরা এই জমি ব্যবহার করতে পারবে-কিন্তু কোনভাবেই বিক্রি করে স্বত্ব হস্তান্তর করতে পারবে না। স্বত্ব হস্তান্তর করতে হলে তাকে জমির মূল্য রাষ্ট্রকে পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় সরকারের বরাদ্দ বাতিল হয়ে যাবে এবং সেই ভূমিটি সরকার পুনরায় কোন ভূমিহীনকে বরাদ্দ দিতে পারবে। ভূমি সংক্রান্ত এসব বিষয় একটি ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকতে হবে।
ভূমিরেকর্ড ব্যবস্থা জিআইএস প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজভিত্তিক হতে হবে। জমির নকশা থেকে শুরু করে দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূমির ডিজিটাল নকশা থাকতে হবে। জমির বেচা-কেনা, উত্তরাধিকার, বণ্টন, দান ইত্যাদি এবং সব ধরনের হস্তান্তরের রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটারে করতে হবে। জমিসংক্রান্ত সব তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করতে হবে। সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুসারে মাত্র পাঁচ বছরে এক হাজার কোটি টাকায় এই কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। (ডিএলআর কর্তৃক আয়োজিত ২৮ জুন ২০০৮ তারিখের সভায় প্রদত্ত তথ্য) এতে আর যাই হোক, টিআইবির রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিবাজ খাত হিসেবে এই খাতটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।
২০১১ সালের ২ জানুয়ারি একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ভূমি ডিজিটাইজেশন করার বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়। সেই সভায় পিপিপি নীতিমালার আলোকে মাত্র ১৮ মাসে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কথা ছিল মার্চ মাসে সেই কাজটি শুরু হবে। এজন্য ইওআই-এর চূড়ান্ত রূপ আমরা ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই দেখতে পাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু ২০১২ সালের মে মাসে তেমন কোন তোড়জোড় আমি কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। আমি ধারণা করি, সেই ইওআই মারা গেছে।
২৮ মে’র সভায় জানা যায় যে, ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমির শ্রেণিবিন্যাস করছে। এরই মাঝে দেশের ২১টি জেলার ভূমির শ্রেণিবিন্যাস হয়ে গেছে এবং বাকি ৪০টি জেলার শ্রেণিবিন্যাস আগামী ২ বছরে সম্পন্ন হবে। এই শ্রেণিবিন্যাস ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করবে।
সেই সভাতেই জানা যায়, বর্তমানে একটি নিবন্ধন দলিল সরবরাহ করতে ৩ বছর সময় লাগে। বালাম বইয়ের অভাবে সেই কাজটিও এখন বন্ধ। ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ না দিলে বালাম বই হবে না। সরকার সেই টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে না। তবে সরকার দলিল স্ক্যান করে বালাম বই বানানোর ও ৩ দিনে মূল দলিল ফেরত দেবার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির ইওআই সম্পন্ন হয়েছে এবং আরএফপি প্রদান করে এই বছরেই কাজটি শুরু করা যাবে বলে জানানো হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয় ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি জরিপের প্রচুর পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং এখনও করছে। এর একটি আরেকটির সঙ্গে সমন্বিত নয়। কোন কোনটি বিপরীতমুখী। এসব প্রকল্পের মাঝে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ৩টি উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যেটির সঙ্গে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থার সমিলতা আছে। ভূমি জরিপ অধিদফতর একটি ডিজিটাল মানচিত্রের কাজ করছে যেটি ডিজিটাল ভূমি জরিপে সহায়তা করতে পারে। সরকার বিদ্যমান রেকর্ড রক্ষা করার জন্য ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে আমাদের কাছে থাকা এসব তথ্য যাই হোক না কেন, অর্থমন্ত্রী মহোদয় তার বাজেট বক্তৃতায় যা উল্লেখ করেছেন তাকে সঠিক বলে মনে করা যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী মহোদয় তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, (ক) ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড প্রণয়নসহ সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীনে দেশের ৫৫টি জেলার খতিয়ানের ডাটা-এন্ট্রি হয়েছে। এক্ষেত্রে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) উরমরঃধষ খধহফ গধহধমবসবহঃ ঝুংঃবস (উখগঝ) প্রবর্তনের জন্য ৭টি জেলার ৪৫টি উপজেলা নির্দিষ্ট করেছে এবং এইসব উপজেলার ভূমি তথ্যসেবা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা হবে। এডিবির সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পের ধাঁচে সারাদেশেই এই প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
(খ) ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ডিজিটাল জরিপ প্রকল্পের কার্যক্রম চলছে। ২১ জেলার ১৫২টি উপজেলায় সেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ভূমির সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহারের জন্য ভূমি জোনিং কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী দুই বছরে সারাদেশে ভূমি জোনিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
(গ) বিভিন্ন দলিলপত্র নিবন্ধন কার্যক্রম যা নিবন্ধন পরিদফতরের মহাপরিদর্শক নিয়ন্ত্রণ করেন, সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় নিবন্ধনকারীরা নিবন্ধন করার সময়ই নিবন্ধিত দলিল পেতে পারেন।
(ঘ) এ ছাড়া সার্ভেয়ার জেনারেল অব বাংলাদেশ এবং স্পারসো’র সহায়তায় ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর সারাদেশের জন্য ডিজিটাল ভূমি ম্যাপ সংগ্রহ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এবং জরিপ কাজের সঙ্গে এই ম্যাপের সমন্বয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এই বিষয়ে বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কোরিয়া প্রজাতন্ত্র তাদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘২৩১। এইসব প্রস্তুতিমূলক কাজের পরিণতিতে এখন আমাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনা এক দফতর থেকে সম্পন্ন করা। এই ব্যবস্থার পথনকশা প্রণয়নের উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই বিষয়ে ডিজিটাল জরিপ অধিদফতর, নিবন্ধন পরিদফতর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর, স্পারসো এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় এই পথনকশাটি চূড়ান্ত করবেন এবং এর বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করা হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত বাস্তবায়িত হলে প্রতি জমির মালিককে একটি ভূমি মালিকানা সনদ (ঈখঙ) প্রদান করা সম্ভব হবে এবং সেই ঈখঙ’র ভিত্তিতে ভূমি অধিকারের বিতর্কিত বিষয়টির সমাধান হবে এবং একই দফরে জরিপ, নিবন্ধন, ভূমির মালিকানা এবং গুণগত শ্রেণী পরিবর্তনের বিষয়টি সুরাহা করা যাবে। ২৩২। ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (উরমরঃধষ খধহফ গধহধমবসবহঃ ঝুংঃবস, উখগঝ) প্রস্তুত করার এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুবিধাভোগীগণ সংশ্লিষ্ট জেলার উপজেলাসমূহের আওতাধীন মৌজার যে কোন প্লটের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত রেকর্ড ও নকশা সংক্রান্ত তথ্যাদি স্বল্পতম সময়ে জানতে পারবেন। এছাড়া নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে স্বল্পতম সময়ে সুবিধাভোগীগণ প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার যে কোন প্লটের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত রেকর্ড ও নকশা সংগ্রহ করতে পারবেন। সার্বিক নিয়ন্ত্রণ সরকারের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এক্ষেত্রে পিপিসি (চঁনরষপ চৎরাধঃব চধৎঃহবৎংযরঢ়, চচচ) অনুসরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ কম্পিউটারাইজেশনসহ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ডিজিটালাইজেশনের পুরো উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সময় সাশ্রয় করার লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে খতিয়ান ও ম্যাপ বিতরণের সেবাটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদানের সুযোগ রাখা হবে।
সামগ্রিকভাবে আলোচিত তথ্যসমূহের আলোকে আমি এই ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরব। আশা করি সামনের পর্বে এই লেখাটি শেষ হবে।

ঢাকা, ২১ জুন ২০১২ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর প্রণেতা ॥ ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net

রবিবার, ১৭ জুন, ২০১২

একুশ শতক ॥ ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর

মোস্তাফা জব্বার
॥ তিন ॥

বাংলাদেশের ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে সাম্প্রতিককালে কিছুটা নড়াচড়া শুরু হয়। এ বিষয়ে সর্বশেষ সভাটি অনুষ্ঠিত হয় গত ২৮ মে ২০১২ অর্থ মন্ত্রণালয়ে (কক্ষ নং ৩৩১, ভবন নং ৭)। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই সভায় অনেক তথ্য জানা যায়। সেই সভার আশু সিদ্ধান্ত হলো একটি রোডম্যাপ তৈরি করার। দু’মাসের মাঝেÑমানে জুলাই ১২ মাসের মাঝে সেই রোডম্যাপ তৈরি হবার কথা। যদিও সেই সভার পর প্রায় তিন সপ্তাহ সময় অতিক্রান্ত হয়েছে এবং রোডম্যাপ তৈরির বিষয়ে কোন অগ্রগতি নেই তথাপি জুলাই মাস পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করতে পারি যে কোন না কোনভাবে এর কিছু না কিছু অগ্রগতি হবে। এই সভাটি অনুষ্ঠানের আগে যেসব কার্যক্রম নেয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো আমরা এখানে তুলে ধরতে পারি।
গত ১১ আগস্ট ২০১০ বাংলাদেশ সচিবালয়ের ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে (ভবন নং ৪, কক্ষ নং ৩২৬) ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরার সভাপতিত্বে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ প্রশাসন ও বেসরকারী উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঘটনাচক্রে আমিও সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম এবং সেই সুবাদে ভূমিসংক্রান্ত সরকারের পরিকল্পনা বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থাটি আমার পক্ষে অবহিত হওয়া সম্ভব হয়। সেই সভার কার্যপত্রে বলা হয়েছিল, “বর্তমান সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় বাস্তবায়নে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর দেশের সকল এলাকায় ডিজিটাল নকশা ও ভূমি মালিকদের রেকর্ড প্রস্তুত, স্যাটেলাইট প্রযুক্তিসহ ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম, ডিজিটাল নকশা ও খতিয়ান প্রণয়ন ডিজিটাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর কর্র্তৃক ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘সাভার ডিজিটাল জরিপ’ ২০০৯-এর কাজ শুরু করা হয়েছে। নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ৪৪টি মৌজায় ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম মাননীয় ভূমি মন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ভিশনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরে সম্প্রতি ১৯১টি মৌজায় সম্পাদিত জরিপ অনুযায়ী ৪,৪১,৫০৬ (চার লাখ একচল্লিশ হাজার পাঁচশত ছয়)টি খতিয়ান ও ৪,০৮৯ (চার হাজার ঊননব্বই)টি মৌজাম্যাপ শীট ডিজিটাইজেশনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রস্তুতকৃত রেকর্ড ওয়েবসাইটে শীঘ্রই উদ্বোধন করা হবে। ‘কম্পিউটারাইজেশন অব ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অব ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট’ শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় ঢাকা জেলার ৫টি উপজেলাকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে নেয়া হয়েছে। এ কাজে সফলতা পাওয়া গেলে সারাদেশে ৬৪ জেলাকে এর আওতায় আনা সম্ভব হবে।
সর্বশেষ জরিপে প্রণীত মৌজাম্যাপ ও খতিয়ানের ওপর ভিত্তি করে পার্বত্য তিন জেলা ব্যতীত বাংলাদেশের সব উপজেলা ও সিটি সার্কেলের ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের লক্ষ্যে “ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ ও রেকর্ড প্রণয়ন এবং সংরক্ষণ প্রকল্প (১ম পর্যায়) প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২,০৫২.৮৪ (দুই হাজার বায়ান্ন দশমিক আট চার কোটি) টাকা। প্রকল্পটিতে অর্থ বিভাগের সম্মতি পাওয়া গিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে শীঘ্রই তা প্রেরণ করা হবে। এ ছাড়া সেটেলমেন্ট প্রিন্টিং প্রেসের সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে নতুন করে প্রমাপ অর্জনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ডিজিটাল জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং, আন্তর্জাতিক সীমার স্ট্রিপ ম্যাপ ডিজিটাইজেশন ও আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রস্তুতকরণ, ম্যাপ প্রিন্টিং প্রেসের আধুনিকায়ন, সারাদেশে ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়ন অগ্রগতি, ডিজিটাল ভূমি তথ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ ‘ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রজেক্ট শীর্ষক’ প্রকল্পের আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর সহায়তায় ১২.৯৭ মিলিয়ন ডলার ঋণের আশ্বাস পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৫টি জেলার ৪৫টি উপজেলার সব মৌজার সর্বশেষ জরিপে প্রণীত মৌজাম্যাপ ও খতিয়ান এবং মিউটেশন খতিয়ানকে ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল ভূমিব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
কার্যপত্রটি পাঠ করার পর বুকটা ফুলে যাবার মতো দশা হয়েছিল। সভায় মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, মহাপরিচালক ও অন্যরা যেভাবে এই ডিজিটাল রূপান্তরটি দুয়েক বছরের মাঝেই সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছিলেন তাতে আমি সত্যি সত্যি খুশি হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু যদি কোনভাবে অতীতের দিকে নজর যায় তবে তার মাঝে হতাশা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। অতীতেও এমন অনেক পাইলট প্রকল্প সাফল্যজনকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে যার মৃত্যু হয়েছে সেখানেই। খতিয়ান ও মৌজা মুদ্রণ কাজটির সূচনা হয়েছে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে-কিন্তু সফলতা একেবারেই নেই। তবুও যদি এডিবির টাকায় এত বড় কাজটি শুরু হতে পারেÑএতে আমাদের আশায় বুক বাঁধার উপায় থাকবে।
সভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ভূমি রেকর্ড ও ভূমি জরিপ অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক ড. আসলাম আলমের উপস্থাপনা। তিনি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। তার আলোচনায় অনেক বাস্তব প্রেক্ষিত আলোচিত হয়েছে।
আমি এখানে বিষয়গুলোকে খুব সংক্ষেপে আবার উল্লেখ করছি। প্রথমে আইনের কথা বলা যায়। আমাদের দেশের উত্তরাধিকারী আইন ও ভূমি সংক্রান্ত অন্যান্য আইন কার্যত ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের। ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি বড় লক্ষ্য হতে হবে ভূমি সংস্কার এবং এর ব্যবস্থাপনার আমূল সংস্কার। প্রথমত এজন্য ভূমিসংক্রান্ত আইনগুলোকে আমূল বদলাতে হবে। এর মাঝে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি মীমাংসা করতে হবে সেটি হচ্ছে মালিকানা। কেউ একটি জমি কিনল এবং সেই কেনা জমি অন্য একজন দখল করে রাখলে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ হবে- সেটির মীমাংসা হতে হবে। জমির নিবন্ধন মানেই মালিকানা-নাকি দখল মানেই মালিকানা সেটি যেমন জরুরী, তেমনি কার উত্তরাধিকার কে কার কাছে বিক্রি করল বা কে ভোগ দখল করল এসব প্রশ্নের মীমাংসার জন্যও আইনের সুনিদির্ষ্টি নির্দেশনা থাকা দরকার। আবার কে খাজনা দিল, কার নামে দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে কে জমিটা বিক্রি করতে পারে বা কে পেতে পারে না ইত্যাদি ছাড়াও আছে জমির অতীত অনুসন্ধান ও মালিকানা নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতা। এক নাম্বার খতিয়ান বা খাস জমিবিষয়ক জটিলতা ও অর্পিত সম্পত্তিবিষয়ক জটিলতারও অবসান হওয়া চাই। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে পৃথক আদালত করে ভূমি সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। সাম্প্রতিককালে একটি বড় পরিবর্তন হয়েছে ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে। এখন কেবল দলিল হলেই সেটি নিবন্ধিত হয় না। ভূমির বিগত ২০ বছরের মালিকানার বিবরণ দলিলে কেবল থাকলেই হয় না, কাগজপত্রও দাখিল করতে হয়। আমরা সচিবালয়ে এসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বলে শুনছি কিন্তু বাস্তবে এর অবস্থা কি সেটি এখনও জানি না। দলিল নিবন্ধন করার সময় কে কতটা জাল তথ্য কিভাবে দিতে পারেন সেই বিষয়টি তদন্ত করে দেখে সংশোধনের ব্যবস্থা দরকার।
ভূমি নিবন্ধনের আরেকটি কাজের কথা শুনছি। সেটি হচ্ছে মূল দলিল হস্তান্তর নিয়ে। সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তারা মূল দলিলের স্ক্যান করা কপিকে প্রিন্ট করে বালাম বই বানাতে শুরু করবেন এবং মূল দলিলটি তারা তাৎক্ষণিকভাবেই ফেরৎ দিতে পারবেন। ২৮ মে’র সভাতে সেই তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে আমি মনে করি, ভূমিব্যবস্থাপনাকে এনালগ বা কাগজভিত্তিক রেখে আইন বদলালেও তার প্রকৃত সুফল জনগণ পাবে না। এজন্য ভূমির তথ্যাদি বিদ্যমান এনালগ কাগুজে পদ্ধতিকে ডিজিটাল করতে হবে। ভূমি সংক্রান্ত সকল ধরনের নকশা ডিজিটাল করতে হবে। জমি রেজিষ্ট্রি, হস্তান্তর, রেকর্ড, মামলা-মোকদ্দমা, আইনী ব্যবস্থা ইত্যাদি সবকিছুই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও বিতরণ করতে হবে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংগৃহীত চিত্রকে ভিত্তি করে, জিও রেফারেন্স সংযুক্ত করে ডিজিটাল নকশা তৈরি করে এর সাথে জমির মালিকানা এবং অন্যান্য তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতে হবে। এইসব তথ্য সাধারণ মানুষ যাতে খুব সহজেই পেতে পারে তার জন্য এগুলো ইন্টারনেটে পাবার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বলা দরকার যে, কেবল ইন্টারনেটে তথ্য রাখলেই দেশের সাধারণ মানুষ সেইসব তথ্য নিজেদের কাজে লাগাতে পারবে তেমনটি ভাবার কোন কারণ দেখিনা। বরং আমি মনে করি যে, ইন্টারনেটে তথ্য রাখার পাশাপাশি গ্রামের মানুষের হাতের কাছে ভূমিবিষয়ক ডিজিটাল তথ্য অবশ্যই পৌঁছাতে হবে।
এই ডিজিটাল ব্যবস্থাটি এমন হবে যে, মানুষ যেমন করে টেলিফোন বিল বাড়িতে বসে জানতে পারে, ব্যাংকের ব্যালেন্স যেমন করে জানতে পারে. একটি স্টার তারপর তিন/চারটি সংখ্যা এবং হ্যাস বোতাম চাপে ও পুরো তথ্যটি তার কাছে চলে আসে, তেমনি মানুষ এটিও জানতে পারবে যে, কোন জমিটি কার মালিকানায় আছে, এর খাজনা কত, কবে এর শেষ খাজনা দেয়া হয়েছে এবং এটি কার দখলে আছে। একই সঙ্গে মানুষ এটিও জানতে পারবে যে, জমিটি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক দেয়া আছে কিনা বা এর মালিকানা নিয়ে কোন আদালতে কোন মামলা আছে কিনা ইত্যাদি। মালিকানার বদল বা অন্য কোন রেকর্ডের পরিবর্তনও সঙ্গে সঙ্গে আপডেট করতে হবে। ফলে ভূমি নিয়ে জালিয়াতি-প্রতারণা করার কোন সুযোগ থাকবে না। ভূমি রেকর্ডের সাথে ডিজিটাল ভোটার তালিকা এবং ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পকে যুক্ত করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে এটি জানা যাবে যে, কোন ব্যক্তির কোথায় জমি আছে এবং কোন সম্পদের মালিক কে। প্রতিটি মানুষেরই একটি সম্পদের বিবরণী থাকতে হবে। দেশের (প্রয়োজনে বিদেশেরও) যেখানেই তার যেসব সম্পদ থাকবে তার বিবরণ ঐ হিসাবে থাকবে। কেউ সেই সম্পদ বিক্রি করলে সেটি তার হিসাব থেকে বাদ যাবে। আবার কেউ কোন সম্পদ কিনলে তার হিসাবে সেই সম্পদ যোগ হবে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসাব থেকে শুরু করে আয়কর পর্যন্ত সবকিছুই একটি বোতামের নিচে নিয়ে আসা যাবে।

ঢাকা, ১৫ জুন ২০১২ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস- আবাস’র চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রণেতা ॥ 
ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net

শনিবার, ৯ জুন, ২০১২

ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর

মোস্তাফা জব্বার


॥ দুই ॥
গত সপ্তাহে এই কলামে আমরা ভূমি ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। বিষয়টি যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব বহন করে তার একটি প্রমাণ হলো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত তাঁর বাজেট বক্তৃতার একটি বড় অংশজুড়ে ভূমি ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি চলমান উদ্যোগ ও সম্ভাব্য উদ্যোগ; উভয় বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আমরা আমাদের প্রেক্ষিতটি পর্যালোচনা করার পর অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্যগুলোর আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার ৮ জুলাই ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি খবর অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন ৪৪৪ একর কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এই হিসাবে প্রতিঘণ্টায় কমছে ১৮ একর জমি। এভাবে চললে আগামী ২০৫৭ সালে এক ইঞ্চি জমিও থাকবে না চাষাবাদ করার জন্য। পত্রিকার খবরে আরও বলা হয়, ১৯৭৪ সালে মোট আবাদি জমি ছিল মোট জমির ৫৯ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সেটি কমে ৫৩ শতাংশে নেমে আসে। তখনকার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ১ লাখ ৬০ হাজার একর আবাদি জমি কমছে। 
দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের কারও মাঝেই এ বিষয়ে কোন উদ্বেগ বা শঙ্কা লক্ষ্য করছি না। কেউ যেন ভাবছেন না, ফসলি জমি না থাকলে আমাদের পরিণতি কি হবে? বড় কষ্ট নিয়ে বলতে হচ্ছে, ফসলের জমি না থাকলে কোটি কোটি মানুষের খিদায় অন্ন আসবে কোন্ উৎস থেকে; কথাটি অনুগ্রহ করে কেউ না কেউ ভাবুন।
এ বিষয়ে সম্ভবত কেউ বিতর্ক করবেন না যে, দিনে দিনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনগণের বসবাস করার জন্য জমি ব্যবহৃত হওয়ায় চাষযোগ্য জমি কমছে। এছাড়াও হাটবাজার, রাস্তাঘাট, বাধ-কালভার্ট-সেতু, কারখানা. পেট্রোল পাম্প এবং অন্যান্য কাজেও প্রচুর ভূমি ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ বা অন্য কোন আইন কোনভাবেই কার্যকর নয়।
সম্প্রতি ভূমি নিয়ে সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ্য করেছি আড়াইহাজারে। সেনাবাহিনী সেখানে একটি আবাসিক এলাকা স্থাপন করতে গিয়ে প্রচ- প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করার জন্য ত্রিশালের মানুষ প্রথমে প্রতিবাদ করে এবং পরে আড়িয়াল বিলে রক্ত দিয়ে সেখান থেকে সরকারকে পিছু ফিরে আসতে হয়। তবুও বিশেষত ঢাকা থেকে চারদিকে; যেদিকেই যাওয়া যাক না কেন, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর ভূমি দখল আশঙ্কাজনকভাবে চোখে পড়বে। ভয়ঙ্করভাবে চোখে পড়বে যে তারা যেসব জমি দখল করছে তার সবই ফসলি জমি, পুকুর, বিল বা ডোবা। এর ফলে পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে।
তবে ভূমি নিয়ে বাংলাদেশের বড় সঙ্কট হলো এর ব্যবস্থাপনায়। ব্রিটিশ আমল থেকে বিরাজিত এই ভূমি ব্যবস্থায় কার্যকর; কোন সংস্কার হয়নি। বিগত দিনগুলোতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন করা হলেও আমূল ভূমি সংস্কার কেউ করেনি। কারও কর্মসূচীতেও ভূমি সংস্কার নেই। কোন রাজনৈতিক দল এই কাজটি করতে চায় না। বড় দলগুলো তো বটেই ছোট, বাম বা প্রগতিশীল দলগুলোও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাব প্রদান করে না। তারা হাসিনা-খালেদাকে বদলালেও ভূমির ব্যবস্থাপনা বদলাতে রাজি নন। 
ভূমি সংস্কার নিয়ে তেমন কোন কাজ হয়নি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পিও ৯৮-এর আওতায় ভূমির সিলিং ১০০ বিঘা করলেও নানা ফাঁকফোকর দিয়ে জোতদারের জমি জোতদারের কাছেই থেকে গেছে। তারা নামে-বেনামে, এক পরিবারকে নানা পরিবারে বিভাজিত করে এসব জমি কাগজেকলমে হস্তান্তর করে নিজের পরিবারের মাঝেই রেখে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তখনকার প্রেক্ষিতে ১০০ বিঘার সিলিংটাই সঠিক ছিল না। সেটি দশ একর বা ১০০০ শতাংশ হলে কিছু ফল পাওয়া যেত। ফলে বঙ্গবন্ধুর ভূমি সংস্কারের ঘোষণার পরও দেশের মোট চাষযোগ্য ভূমির বৃহদংশ স্বল্পসংখ্যক লোকের (পরিবার বললে ভাল হয়) হাতে পুঞ্জীভূত রয়েছে। এই জনগোষ্ঠী আবার নিজেরা জমির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। তারা শহুরে বা অন্য পেশায় জীবনধারণ করে। কৃষক বা ভূমিহীন বা বর্গাচাষীরা এদের জমি চাষ করে। 
১০০ বিঘার সীমাকে বেশি মনে করে ১৯৮৪ সালে কৃষিজমির সর্বোচ্চ সীমা ৬০ বিঘা করা হয়। কিন্তু তাতেও কোন সুফল পাওয়া যায়নি। কারণ জমিগুলো যখন পরিবারের বিভিন্নজনের হাতে ভাগ হয়ে যায় তখন ৬০ বিঘার বাড়তি জমি আর অবশিষ্ট থাকেনি।
বর্তমানে দেশে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা কোটি কোটি। বাসস্থান নেই কোটি কোটি মানুষের। শহরের বস্তি এলাকার অধিবাসীরা প্রকৃতার্থেই ছিন্নমূল। ভূমি ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য সরকারের খাসজমি ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চরম দুর্নীতি। প্রকৃত ভূমিহীনরা খাসজমি পায় না। জোতদাররাই নামে-বেনামে খাসজমি দখল করে থাকে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সরকারী কর্মচারীরাও দুর্নীতির মহাসমুদ্রে বাস করে। জমি রেজিস্ট্রি থেকে জরিপ; সর্বত্রই ঘুষ ছাড়া কিছুই হয় না। কিন্তু এর চাইতে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে ভূমি নিয়ে বিরোধ। দীর্ঘদিন ধরে কায়িকভাবে ভূমির রেকর্ডপত্র রক্ষা, রেজিস্ট্রেশন, নকশা প্রস্তুত ও জালিয়াতি ইত্যাদি করার ফলে ভূিম নিয়ে বিরোধ দিনে দিনে বাড়ছে।
সন্ত্রাস, খুনখারাবি, ঝগড়াবিবাদের বড় উৎসই হলো ভূমিসংক্রান্ত। দেশের সর্বাধিকসংখ্যক মামলা-মোকদ্দমাও ভূমি সংক্রান্ত। জালিয়াতি, প্রতারণা, জবরদখলের সঙ্গেও ভূমি ব্যবস্থাপনা জড়িত। সম্প্রতি ভূমিদস্যুতা নামের নতুন একটি অপরাধ যুক্ত হয়েছে। এক ধরনের লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী অস্ত্রের শক্তিতে, টাকার জোরে, প্রতারণায়, চাপে ফেলে, সন্ত্রাস করে সাধারণ মানুষের জমি কেড়ে নিচ্ছে। বিগত খালেদা জিয়ার আমলে সাভারে সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের আত্মীয়দের গ্রাম দখল নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়। এখনও ঢাকার আশপাশে ডেভেলপার, হাউজিং কোম্পানি এসবের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসংখ্য অভিযোগ। ভূমিদস্যুরা এখন এত শক্তিশালী যে তারা এমনকি মন্ত্রীকেও ধমক দিতে পারে। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পাওে না। সরকারের অনীহা, সরকারী ছত্রছায়া এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির জন্য প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ভূমির প্রকৃত মালিকরা আইনের দ্বারস্থও হতে পারে না।
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থা কেবল একটি প্রাচীন বিষয় নয়, এটি একটি জঘন্য ধরনের জটিল বিষয়। যুগ যুগ ধরে এটি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। নতুন নতুন সঙ্কট ও নতুন নতুন জটিলতা এর সঙ্কট যুক্ত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ভূমি ব্যবস্থাপনার রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতিতে দলিল লেখার ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করা হলেও এর নিবন্ধনে, নাম জারিতে ব্যবস্থাপনায় বা অন্য কোন ক্ষেত্রে অন্য কোন ধরনের পরিবর্তন করা হয়নি। টিআইবির হিসাব অনুসারে এটি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এর কোথাও শত শত বছরেও পরিবর্তনের কোন ছোঁয়া লাগেনি। দেশের সাধারণ মানুষ ভূমি নিয়ে এত বেশি সমস্যা কবলিত যে, সেখান থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায়ও তাদের জানা নেই। সে জানে না কোন্ পথে সে তার বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে পারে। জমি বিক্রি করতে সে বিপদে পড়ে। জমি কিনতে গেলে সমস্যা। জমির উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা। জমির বন্দোবস্ত নিলে সমস্যা। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার যেখানেই জমির সঙ্গে যার সম্পর্ক আছে সেখানেই সমস্যা।
জমি মানেই মামলা। জমি মানেই খুন-জখম, ঝগড়া-বিরোধ। ভূমিসংক্রান্ত মামলা বা বিরোধ বছরের পর বছর সম্প্রসারিত হয়। স্থানীয় সালিশি থেকে সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত সীমাহীনভাবে এর অবাধ বিচরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের মতে, দেশে ভূমিসংক্রান্ত একটি মামলার সাধারণ নিষ্পত্তি হতে ৮ বছর সময় লাগে। এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ১৪ বছর। (সূত্র দৈনিক আজকের কাগজ ২৭ এপ্রিল, ২০০৭) কোন কোন সময় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভূমি সংক্রান্ত মামলা চলে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এর চাইতেও জঘন্য। আমার পৈত্রিক বাড়ির চার হাত জায়গা নিয়ে একটি বিরোধ আদালতে চল্লিশ বছর চলার পর তার নিষ্পত্তি হয়েছে আদালতের বাইরে। আমার জন্য মহম্মদপুরের আবাসিক এলাকায় সরকারের বরাদ্দ করা একটি প্লট নিয়ে ১৯৮৪ সাল থেকে মামলা চলছে এবং সর্বশেষ অবস্থা অনুসারে আমাকে আরেকটি মামলা সুপ্রীমকোর্টে করতে হবে। আমি তো দূরের কথা, কারও সাধ্য নেই এই কথা বলার যে, সেই মামলা আরও কতদিন চলবে। হাইকোর্ট আমাকে সেই বাড়ির দখল প্রদানের জন্য নির্দেশ দিলেও সেখানে বহাল তবিয়তে বেআইনীভাবে দখলদাররা বসবাস করছে। কিন্তু তাদের সরকারও উচ্ছেদ করছে না। ক’দিন আগে আমার নিজের ৪৫ শতাংশ জমির নামজারি করার জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে তারা কাজটি করার জন্য পঁচিশ হাজার টাকা দাবি করে। অথচ আমার কাগজপত্রে কোন ত্রুটি নেই। ক’দিনে কাজটি করা হবে তা নির্ভর করবে টাকার পরিমাণের ওপর। আমি আরেকটু বেশি টাকা দিলে কাজটা তাড়াতাড়ি হবে। নইলে অন্তত তিন মাস সময় লাগবে। একটি সফটওয়্যার কোম্পানির মতে, বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে আছে প্রায় পনেরো কোটি মানুষ। হতে পারে, একই মানুষ একাধিক মামলা বা বিরোধে জড়িয়ে আছে। কিন্তু সংখ্যাটা এমনই।
এতে বোঝা যায়, ভূমি এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য কি ভয়ঙ্কর সঙ্কট তৈরি করে চলেছে। গত ৬ জুন ২০০৯ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ভূমি ব্যবস্থাকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছেন। ডিজিটাল পদ্ধতি ছাড়া এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। কারণ, ভূমির কাজকর্ম একটি বা দু’টি অফিসে সম্পন্ন হয় না। এমনকি একটি মন্ত্রণালয়েও ভূমির কাজকর্ম সীমাবদ্ধ নয়। তিনটি মন্ত্রণালয় এবং অনেক দফতরে ভূমির কাজ হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ভূমির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ভূমিসংক্রান্ত একেক কাজ একেকজন করে থাকে। এদের অবস্থা দ্বীপের মতো। কারও সঙ্গে কারও তেমন কোন সংযোগ নেই। সরকারের যেসব অংশগুলো ভূমি নিয়ে কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর, ভূমি আপীল বোর্ড, ভূমি সংস্কার বোর্ড, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আঞ্চলিক সেটেলমেন্ট অফিস, জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়, উপজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস, সাবরেজিস্ট্রার অফিস ও ইউনিয়ন ল্যান্ড অফিস।
তবে এসব অফিস প্রধানত তিন ধরনের কাজ করে থাকে। একটি হলো ভূমির দলিল নিবন্ধন করা। এটি করে থাকে সাবরেজিস্ট্রার অফিস যা আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। আরেকটি হচ্ছে ভূমির রেকর্ড। এটির জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় রয়েছে। এই দু’টি কাজের বাইরে ভূমির মালিকানা বিষয়টি দেখে থাকে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন আবার ভূমি অধিগ্রহণের কাজও করে থাকে।

ঢাকা, ৯ জুন ২০১২ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিসÑ আবাস’র চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রণেতা ॥ ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net

শনিবার, ২ জুন, ২০১২

একুশ শতক: ভূমিব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর

মোস্তাফা জব্বার
॥ এক ॥
খবরটি দৈনিক সংবাদ পত্রিকার। গত ২৯ মে এই পত্রিকাটিতে খবর প্রকাশিত হয় যে, সমন্বয়হীনতার কারণে ভূমিসংক্রান্ত নথি ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের কাজে ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষপ্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। 
আমি যদি সঠিকভাবে স্মরণ করতে পারি, তবে অর্থমন্ত্রীর এই অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। বরাবরই তিনি অপ্রিয় কথা বলে ফেলেন এবং সেজন্য মাঝে মধ্যে সমালোচনার মুখোমুখিও হন। তবে বাস্তবতা হলো যে, সত্যকে সত্য বলার সাহস তিনি এখনও হারিয়ে ফেলেননি। খবরটির শিরোনাম থেকেই আন্দাজ করা যায় যে, সভায় তিনি কি পরিমাণ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঘটনাচক্রে এই খবরটি যে সভায় জন্ম হয়েছে সেই সভায় আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম এবং পুরো বিষয়টিই আমার জানা। এর আগেও এই বিষয়ে যে কয়টি সভা হয়েছে তাতেও আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ক্ষোভের কথা শুনেছি। তবুও দৈনিক সংবাদ থেকেই খবরটি তুলে ধরছি।
“গত ২৮ মে সচিবালয়ে এ সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা সভা শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান যে ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটাইজেশন কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। এর অন্যতম কারণ সমন্বয়হীনতা। ভূমি মন্ত্রণালয়, জরিপ অধিদফতর এবং নিবন্ধন পরিদফতরের মধ্যে কাজের মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। এ কারণে অনেক দিন আগে কাজটি শুরু হলেও তেমন কোন সুফল পাওয়া যায়নি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমি সংক্রান্ত নথি ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ও সচিব মোখলেছুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেন, ভূমি ডিজিটাইজেশন প্রকল্পে গতি আনতে এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমি সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে বলে অর্থমন্ত্রী জানান।
অর্থমন্ত্রী জানান, সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি অগ্রগতি না হওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হলে এক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দও কোন সমস্যা হবে না। ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমের জটিলতার কথা তুলে মন্ত্রী বলেন, ভূমি নিবন্ধন পদ্ধতি সহজ করা হবে। এক অফিসে সব কাজ (ওয়ান স্টপ সার্ভিস) করা যাবে। এতে সব তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা হবে। নিবন্ধন গ্রহণকারী ব্যক্তি মূল দলিল পাবে। কম্পিউটারে রক্ষিত নথি থেকে ছাপিয়ে (প্রিন্ট করে) তথ্য সরবরাহ করা গেলেও তার কোন পরিবর্তন করা যাবে না। মুহিত আরও জানান, ভূমি ডিজিটাইজেশন কাজের জন্য নেওয়া পাইলট প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়ন করেছে। প্রত্যেক উপজেলায় একটি তথ্য কেন্দ্র স্থাপনে তাদের পরামর্শ রয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় না হলেও দুই উপজেলা মিলে অন্তত একটি তথ্যকেন্দ্র করার ব্যাপারে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভূমি ডিজিটাইজেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে সাবরেজিস্ট্রারদের বাধা দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, ৩টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাইজেশন প্রকল্প চলছে। সেখানে তারা বুঝতে পেরেছে বাধা দিলেও এ প্রকল্প ঠেকানো যাবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার তিন বছর পর অর্থমন্ত্রী এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও আসলে অবস্থাটি মোটেই আশাবাদের নয়।
কারণ ডিজিটাল বাংলাদেশ সোগান দিয়ে তিন বছরেরও বেশি শাসনকাল পার করার পর এখন সাধারণ মানুষের মাঝে প্রতিদিনই প্রশ্ন জাগছে এই সোগানটির বিপরীতে আগামী সময়গুলোতে সাধারণ মানুষ কি সুফল পাবে। এ কথা বলা যাবে না যে, সাড়ে তিন বছরের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচীর তেমন কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। অবশ্যই অনেক কাজ হয়েছে। এক নাগাড়ে অনেক ছোট ছোট কাজের কথা বলা যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। প্রচুর সভা-সেমিনার এমনকি মেলা হয়েছে। মেলা হচ্ছেও। ২০১২ সালে প্রতিটি জেলায় ডিজিটাল বাংলাদেশকে উপস্থাপনা করার জন্য ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরে। মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন ব্যাংকিং এখন অতি সাধারণ বিষয়। নানা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের এটুআই-প্রকল্প পরিচালকের মতে আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বিভাগীয় পর্যায়ের সব সেবা আইসিটি নির্ভর হয়ে যাবে।
তবে খুব বড় মাপের বা চোখ ধাঁধানো কিছু যা গ্রামের মানুষের বা সাধারণ জনগণের জীবনে দৃশ্যমান হয়েছে অথবা মানুষের জীবনকে একদম পাল্টে দিয়েছে তেমন বড় কাজ তেমন একটা দেখা যায় না। আবার অপেক্ষাকৃত বড় মাপের কাজের সব সঠিকভাবে সফল হয়েছে এমনটাও বলা যাবে না। গ্রামে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পত্রিকাগুলোর খবর হচ্ছে, এগুলো যেমনটা চলা উচিত ছিল তেমনটা চলছে না। এমনকি একটি উপজেলার ২৫টির মাঝে ২৩টি তথ্যকেন্দ্রই অচল থাকার খবরও আমরা দেখেছি। তবুও মানুষ সান্ত¡না পেতে পারে যে, এসব তথ্যকেন্দ্র স্থাপিত তো হলো। দিনে দিনে অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটিও সত্য।
আমরা জেনেছি, গ্রামে মোবাইল ব্যাংকিং যাবার কথা। গ্রামের আখচাষীদের ডিজিটাল পুঁজি প্রচলনের কাজটি প্রধানমন্ত্রীই আগে উদ্বোধন করেছেন। জাতীয় তথ্যকোষ নামক একটি ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করে বলা হয়েছে যে, এই ওয়েবসাইটটি থেকে সাধারণ মানুষ বা গ্রামের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই সেলের প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলাম খান বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১১ এ কথা বলেন। এই তথ্যকোষে ৫০ হাজার পৃষ্ঠার তথ্য আছে বলে বলা হয়েছে। দু’বছরে এটি নাকি ৫০ লাখ পৃষ্ঠার তথ্যপঞ্জিতে পরিণত হবে। দেশের ৪৫৯৮টি ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র এই তথ্যকোষ থেকে উপকৃত হবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে মনে করা হয়। পত্রিকার খবর অবশ্য ভিন্ন। বলা হচ্ছে এই তথ্যকোষে প্রয়োজনীয় তথ্য নেই। অনেকেই মনে করেন, তাড়াহুড়ো করে ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র এবং ই-তথ্যকোষ উদ্বোধন করে বস্তুত সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তদুপরি গ্রামের মানুষ এমন কিছু কি পেয়েছে যাকে সে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলতে পারে আমি এটা পেলাম?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম উদ্বোধন করেছেন। ২০ হাজার ৫০০ স্কুলের এমন ক্লাসরুম চালু হবে। এটি গ্রামের মানুষের কাছে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের একটি রূপরেখা তুলে ধরবে।
প্রকৃতার্থেই ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে যখন আমরা কথা বলি তখন আমাদের ভাবতে হয় যে, এই শব্দ বা সেøাগান দিয়ে সাধারণ মানুষ-গ্রামের মানুষ, কৃষক-শ্রমিক কিভাবে উপকৃত হবে। তার সামনে প্রকৃতার্থেই কিভাবে উপস্থিত করা হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা? কিভাবে তার ডিজিটাল লাইফস্টাইল গড়ে ওঠবে। তার সনাতনী কৃষিযুগের জীবনধারায় এর মাঝে শিল্পযুগের বা যন্ত্রযুগের কিছু না কিছু প্রভাব পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তার কায়িক শ্রম যন্ত্র দিয়ে স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে অতি ধীরে ধীরে বদলাতে থাকা জীবনে গ্রামের মানুষ তার চারপাশের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচাই বাছাই করে দেখছে যে, নতুন সমাজ বা নতুন দুনিয়াটা তার জন্য কেমন। তার চারপাশে একসময়ে সে বিদ্যুত পেয়েছে। তবে বিদ্যুতের সুখের চাইতে এখন তার বিড়ম্বনাই বেশি। কারণ এই সুখ তাকে কেবল কষ্টই দেয়, সুখের ঠিকানা দেয় না। এটি পাওয়ার চাইতে না পাওয়ার বেদনা অনেক বেশি। সে তার ব্যবহারের জন্য ডিজেল ইঞ্জিন পেয়েছে। সেই ইঞ্জিন সে পানি সেচে ব্যবহার করে, নৌকায় লাগায়, ধান মাড়াই কলে লাগায় বা ভ্যান গাড়ি চালাতে ব্যবহার করে। তার চারপাশে সে বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল পেয়েছে। তার হাতের কাছে সে এক সময়ে রেডিও পেত। এখন সে টিভিও পায়। এসব যন্ত্র সে ডিজিটাল বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারণ করার আগেই পেয়েছে। এর বাইরে আধুনিক জীবন বলতে তার কাছে পৌঁছেছে মোবাইল ফোন। এটি তার জীবন বদলে দিয়েছে অনেকটা। দিনে দিনে তার মোবাইল ফোন তাকে বেশ কিছু সেবা দিতে শুরু করেছে। এই যন্ত্রটি তার অতি চেনা কথা বলার যন্ত্র। একে সে এখনও আলাদাভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের বিষয় হিসেবে দেখে না। তবে দিনে দিনে এর মাঝে এমন সব সেবা সে পেতে শুরু করেছে যাকে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কিন্তু আমরা যদি তাকে সত্যি সত্যি ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বাদ দিতে চাই তবে তার অতি প্রয়োজনীয় এবং দৈনন্দিন জীবনের অংশবিশেষকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। ভূমি হলো তার তেমন একটি ক্ষেত্র। সেজন্যই তার ভূমি ব্যবস্থার খোল নলচে পাল্টাতে হবে। 
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে যে, বাংলাদেশের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আখড়াটি হলো ভূমি ব্যবস্থায়। বাংলাদেশে বসবাসকারী কোন মানুষকে এই বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করার জন্য কোন তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে না। তাকে কোন পরিসংখ্যান দিয়ে কোন বিষয় প্রমাণ করতে হবে না। কারণ প্রায় প্রতিটি মানুষই জানে যে, এর সঙ্গে কেবল দুর্নীতিই নয়, দেশের মামলা মোকদ্দমার সিংহভাগও জড়িত। সম্ভবত এটিও সত্য যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাটিও হতে যাচ্ছে ভূমিসংক্রান্ত। আমরা জানি জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। আমরা কিলোমিটার প্রতি এত বেশি লোক বাস করি যে, এক সময়ে আমাদের সকল মানুষের জন্য শুধু বাসস্থান পাওয়াই দুরূহ হয়ে পড়বে। মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইল একটি ভূখ-ে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস সত্যিই অভাবনীয়। তদুপরি প্রতিদিন বাড়তি জনসংখ্যার চাপ নিতে হচ্ছে এই দেশটিকে। দেশের কিছু বিশেষ এলাকা যেমন উপকূল, দ্বীপ, জলাভূমি-নিম্নাঞ্চল, বিল অঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল বা হাওর অঞ্চল; যেখানে মানুষের বসবাস প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি, সেসব অঞ্চল ছাড়া প্রয়োজনীয় বাসস্থান এবং চাষের জমি বলতে গেলে নেই। নগরায়ন বা শিল্পায়ন জমির ওপর আরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। 

ঢাকা, ১ জুন ২০১২ ॥ লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রণেতা ॥ ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com.পড়স, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net